বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী আগামী ২৪ মে ২০২৬ (রবিবার)। মহান এই জাতীয় কবি’র সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানতে নিচের লেখাগুলো পড়ুন।
বিদ্রোহী-কবি-কাজী-নজরুল-ইসলামের-১২৭তম-জন্মজয়ন্তী
কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের ‘জাতীয় কবি‘। তাঁর সম্বন্ধে যতোই আলোচনা করা হোক, তা অতি দুঃসাহসের ব্যাপার। সুতরাং মহান এই কবি সম্পর্কিত অজানা কিছু তথ্যই আজকের আলোচনার বিষয়।

সূচিপত্রঃ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী

কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মস্থান ও তারিখ
কবির শৈশবকাল এবং ধীরে ধীরে বেড়ে উঠা
কবি’র পেশাগত জীবন-যাপন
কবি হিসেবে প্রথম স্বীকৃতি
কবি’র সাংবাদিকতা জীবন ও বৈবাহিক অবস্থা
কোন কাব্য রচনার জন্য তাঁকে জেলে যেতে হয়
কবি নজরুল ইসলাম পরিচালিত চলচ্চিত্র কোনটি?
কাজী নজরুল ইসলামের বিভিন্ন সম্মাননা ও পদক প্রাপ্তি
নজরুল ইসলাম রচিত নিষিদ্ধ গ্রন্থসমূহ
কবি কাজী নজরুল ইসলাম কর্তৃক অনুবাদকৃত গ্রন্থসমূহ
বাংলাদেশে আগমন এবং জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী-শেষ কথা

কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মস্থান ও তারিখঃ

আসছে ২৪ মে ২০২৬ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী পালিত হব। অর্থাৎ অসংখ্য গুণে গুণান্বিত, প্রতিভাধর এই মহামানব জন্মগ্রহণ করেন ২৪ মে ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে (১১ জৈষ্ঠ্য, ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহাকুমার চুরুলিয়া গ্রামের এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে। পিতার নাম কাজী ফকির আহমেদ এবং মাতা জাহেদা খাতুন। নজরুল ইসলামের পিতা কাজী ফকির আহমেদ এর দ্বিতীয় স্ত্রী জাহেদা খাতুনের চার পুত্রের অকাল মৃত্যুর পর জন্মগ্রহণ করেন এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ কাজী নজরুল ইসলাম। যেহেতু চার পুত্রের মৃত্যুর পর তাঁর জন্ম হয়, সেই কারণে তাঁর নাম রাখা হয় ‘দুখু মিয়া’।

কবির শৈশবকাল এবং ধীরে ধীরে বেড়ে উঠাঃ

নজরুল ইসলামের বাল্যকালে অনেকেই তাঁকে ‘নজর আলী’ বা ‘ত্যারা ক্ষ্যাপা’ নামে ডাকতেন। তিনি সাহিত্যের অনেক জায়গায় ‘নুরু’ নামটিও ব্যবহার করেছেন। মাত্র আট বছর বয়সে তাঁর পিতার মুত্যুর পর তিনি চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিনাতিপাত করেন। এ সময় পারিবারিক অভাব-অনটনে তাঁর শিক্ষা জীবন বাধাগ্রস্ত হয়ে ওঠে। তবে নজরুল ইসলামের প্রাথমিক শিক্ষা জীবন ছিল ধর্মীয়। এখানেই তিনি কুরআন, ইসলাম ধর্ম, দর্শন ও ইসলামী ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে অধ্যয়ন শুরু করেন। আর এই সময়ে তিনি মক্তব থেকে নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উক্ত মক্তবেই শিক্ষকতা শুরু করেন। তিনি স্থানীয় এক মসজিদে কিছুদিন মুয়াজ্জিন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। আর এই স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন মৌলিক আচার ও অনুষ্ঠানের সাথে খুব ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেন, যা পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্য চর্চাকে বিপুল ভাবে প্রভাবিত করেছে। বলাবাহুল্য যে. কৈশোরকালে তিনি বিভিন্ন নাট্য দলের সাথে কাজ করতে গিয়ে কবিতা, নাটক ও সাহিত্য সম্বন্ধে ধারণা লাভ করেন। কবি নজরুল ইসলাম বাল্যকাল থেকেই লোকশিল্পের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করতেন। অর্থাৎ এই সময়েই তিনি ‘লেটো’ নামের একটি ভ্রাম্যমান নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত হোন। দলটি বাংলার রাঢ় অঞ্চলের কবিতা, সঙ্গীত এবং নৃত্যের মিশ্র আঙ্গিক চর্চার একটি ভ্রাম্যমাণ নাট্যদল ছিলো। এখানে একটি বিষয় না বললেই নয়, তা হলো, নজরুল ইসলামের চাচা কাজী বজলে করিম অত্রাঞ্চলের বিশেষ করে লেটো দলের বিশিষ্ট ওস্তাদ ছিলেন এবং তাঁর আরবি, ফারসি এবং উর্দু ভাষার উপরে দখলতা ছিলো। এ ছাড়াও চাচা বজলে করিম সাহেব মিশ্র ভাষায় গান রচনায়ও দক্ষ ছিলেন।

আরও পড়ুনঃ নিঃসঙ্গতা নিয়ে ৩০টি বাণী - নিঃসঙ্গতা নিয়ে উক্তি

ধারণা করা হয় যে, নজরুল ইসলামের চাচা বজলে করিম সাহেবের প্রভাবেই হয়তো লেটো দলে যোগ দিয়েছিলেন। আর এই লেটো দলে থাকাকালেই তিনি সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। তিনি. এই লেটো দলের সাথে বিভিন্ন স্থানে যেতেন, অভিনয় শিখতেন এবং নাটকের জন্য গান ও কবিতাও লিখতেন। অসম্ভব প্রতিভাবান এই ব্যক্তি তাঁর কর্ম অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলা ও সংস্কৃত চর্চা শুরু করেন এবং পাশাপাশি তিনি সনাতন ধর্মাবলম্বী গ্রন্থসমূহ যেমন-পুরাণসহ অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। যার প্রভাব আমরা দেখতে পাই তার চাষার সঙ, শকুনীবধ, রাজা যুধিষ্ঠীরের সঙ, দাতা কর্ণ, মেঘনাদ বধ, বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রৌ রাজপুত্রের গান, বিদ্যাভুতুম, কবি কালিদাস এবং আকবর বাদশাহ উল্লেখযোগ্য। তিনি ‘মা কালি’ কে নিয়েও প্রচযর শ্যামা সঙ্গীত রচনা করেছেন। নজরুল ইসলামের প্রথম স্কুল ছিল রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুল। পরবর্তীতে ভর্তি হোন মাথুরন উচ্চ ইংরেজি স্কুলে যা নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউশন নামে পরিচিতি লাভ করে। এখানে তিনি ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করে আবার কাজে ফিরে যান। কাজ-কর্মে জীবন অতিবাহিত করার এক পর্যায়ে তিনি আসানসোলের একটি চা-রুটির দোকানে রুটি বানানোর কাজ নেন।

কবি’র পেশাগত জীবন-যাপনঃ

কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকে তৎকালীন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। প্রথমে কোলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে এবং পরবর্তীতে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার জন্য তিনি সীমান্ত প্রদেশের নওশেরায় চলে যান। অর্থাৎ প্রশিক্ষণ সফলতার সাথে সমাপ্ত করে করচি সেনানিবাসে সৈনিক হিসেবে প্রায় আড়াই বছর (১৯১৭ এর শেষ দিকে-১৯২০) চাকুরী করেন। এই আড়াই বছরে তিনি পদোন্নতি পেয়ে হাবিলদার হয়েছিলেন। তিনি সেনানিবাসে থাকাকালীন এক পাঞ্জাবী মৌলবির কাছে ফারসি ভাষা শিখেন id="7" পাশাপাশি সহকর্মীদের সাথে তিনি দেশি-বিদেশী নানা বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ে সঙ্গীতের চর্চাও অব্যাহত রাখেন। প্রতিভাবান এই মানুষটি সেনানিবাস থাকাকালীন অনেকগুলো সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করেন, যার মধ্যে-ব্যথার দান, মেহের নেগার হেনা, ঘুমের ঘোরে, সমাধি নামক কবিতা, বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী (প্রথম গদ্য), মুক্তি (প্রথম প্রকাশিত কবিতা) ইত্যাদি।

কবি হিসেবে প্রথম স্বীকৃতিঃ

১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ ডিসেম্বর, কবি কাজী নজরুল ইসলামকে তৎকালীন কলকাতার অ্যালবার্ট হলে জাতীয় সংবর্ধনা প্রদান করা হয়, যার সভাপতিত্ব করেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। অর্থাৎ তিনিই প্রথম সভাপতির ভাষণে নজরুল ইসলামকে ‘প্রতিভাবান বাঙালি কবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

কবি’র সাংবাদিকতা জীবন ও বৈবাহিক অবস্থাঃ

১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জুলাই ‘নবযুগ’ নামক একটি সান্ধ্য পত্রিকা প্রকাশিত হয়। আর এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক। নজরুলের সাংবাদিকতা জীবন শুরু হয় এই পত্রিকার মাধ্যমেই। তিনি ‘নবযুগ’ পত্রিকায় “মুহাজিরীন হত্যার জন্য দায়ী কে?” নামক একটি প্রবন্ধ লিখেন। আর এই প্রকাশিত প্রবন্ধের ফলে পত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং সেই সময়েই নজুরুল ইসলামের উপরে পুলিশের নজরদারী শুরু হয়। এ সময়ে তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপট খুব কাছাকাছি হতে দেখার সুযোগ পান সাংবাদিকতার মাধ্যমে।

১৯২১ সালের এপ্রিল হতে জুন মাসের দিকে গ্রন্থ প্রকাশক আলী আকবর খানের সাথে তৎকালীন মুসলিম সাহিত্য সমিতির পত্রিকা অফিসে পরিচিত হোন। আর সে সময়ে তিনি আলী আকবর খানের সাথে কুমিল্লা বিরজা সুন্দরী দেবীর বাড়ীতে বেড়াতে যান। ঠিক এখানেই তাঁর সাথে প্রমিলা দেবীর পরিচয় ঘটে। যদিও আমরা অনেকেই জানি যে, প্রমিলা দেবীর সাথে কবি নজরুল ইসলামের বিবাহ হয়েছিল, কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, নজরুল ইসলামের সাথে প্রথমে আলী আকবর খানের ভগ্নী নার্গিস আসার খানমের বিয়ে ঠিক হয়। বিয়ের আখতও যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়। কিন্তু ঝামেলা বাধে, কাবিনের শর্ত অনুযায়ী নজরুল ইসলামকে ঘর জামাই থাকতে হবে। তিনি তা অকপটে অস্বীকার করেন এবং নার্গিস আসার খানমের সাথে বাসর সম্পন্ন হবার আগেই তিনি কুমিল্লা শহরে বসবাসরত বিরজা সুন্দরী দেবীর বাড়িয়ে চলে আসেন। এ সময় কবি খুব অসুস্থ ছিলেন। ফলে প্রমিলা দেবী আত্মনিবেদিত প্রাণে নজরুল ইসলামকে সেবা করতে থাকেন। আর ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যে পরিণয় এবং পরিশেষে বিবাহ বন্ধনে উভয়ে আবদ্ধ হন।

কোন কাব্য রচনার জন্য তাঁকে জেলে যেতে হয়ঃ

১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে ‘ধুমকেতু’ পত্রিকায় নজরুল ইসলামের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি প্রকাশিত হলে তা নিষিদ্ধ হয় এবং তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময়ে হুগলী জেলার কারগারে কবির সাথে বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদে তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। বিষয়টি কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের নজর এড়ায়নি। তিনি কবি নজরুল ইসলামকে একটি টেলিগ্রাম মেসেজ পাঠান এবং ঠিক একই সময়ে ‘বসন্ত’ নাটকটিও নজরুল ইসলামকে উৎসর্গ করেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, যথাযথ ঠিকানা না থাকায় জেল কর্তৃপক্ষ কবি গুরু রবীন্দ্রনাথে চিঠিটি ফেরত পাঠান।

আরও পড়ুনঃ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে অজানা তথ্য

কবি গুরুর মেসেজটি ছিল-"Give Up hunger strike, our literature claims you." যাইহোক কবি নজরুল ইসলাম অনশনের ঠিক ৩৯ দিনের মাথায় কুমিল্লার বিরজা সুন্দরী দেবীর অনুরোধে অনশন ভঙ্গ করেন। মজার বিষয় হলো, এ সময়ে জেল কর্তৃপক্ষ তার বক্তব্য জানতে চাইলে, তিনি মাত্র ৪ পৃষ্ঠায় তা লিপিবদ্ধ করে আদালতে উপস্থাপন করেন। তাঁর স্বহস্তে লিখিত এই ৪ পৃষ্ঠার দলিলকেই বলা হয়, ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ যেখানে তিনি নিজেকে ‘বিদ্রোহী’ কবি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯২৩ সালের অক্টোবরে জেল হতে ছাড়া পান।

কবি নজরুল ইসলাম পরিচালিত চলচ্চিত্র কোনটি?

কবি কাজী নজরুল ইসলাম অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘ধ্রুব’। তবে ফিলিপ স্পারেল কানাডায় নজরুল ইসলামকে নিয়ে ‘নজরুল’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।

কাজী নজরুল ইসলামের বিভিন্ন সম্মাননা ও পদক প্রাপ্তিঃ

১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’-এ ভূষিত করেন। এরপর তৎকালীন ভারত সরকার ১৯৬০ সালে তাঁকে সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘পদ্মভূষণ’ প্রদান করেন। ১৯৬৯ সালে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যলয় হতে এই মহান কবিকে ‘ডি.লিট’ উপাধিতে ভূষিত করেন এবং ১৯৭৪ সালেও বাংলাদেশ সরকারও তাঁকে ‘ডি.লিট’ উপাধি প্রদান করেন। এরপর ১৯৭৬ সালে আবারও বাংলাদেশ সরকার কবি কাজী নজরুল ইসলামে ‘একুশে পদক’ প্রদান করেন।

নজরুল ইসলাম রচিত নিষিদ্ধ গ্রন্থসমূহঃ

প্রখ্যাত সাহিত্য সমালোচক শিশির কর তাঁর ‘নিষিদ্ধ নজরুল’ নামক গ্রন্থে নজরুল ইসলাম রচিত মোট ৫টি নিষিদ্ধ গ্রন্থের উল্লেখ করেছেন। যেগুলি ছিল-‘যুগবাণী’, এটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ নভেম্বর এবং পরবর্তীতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয় ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে। এরপর ‘বিষের বাঁশি’ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের ২২ অক্টোবর এবং এটিরও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয় ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ এপ্রিল। এ ছাড়া ‘ভাঙার গান’ নিষিদ্ধ হয় ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের ১১ নভেম্বর, ‘প্রলয়শিখা নিষিদ্ধ হয় ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ সেপ্টেম্বর এবং ‘চন্দ্রবিন্দু’ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ অক্টোবর তারিখে। শিশির কর বলেছেন যে, নজরুল ইসলামের ‘অগ্নিবীণা; কাব্যটি কখনোই নিষিদ্ধ হয়নি। তবে এ কাব্যের ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’ কবিতাটি নিষিদ্ধ হয়েছিল ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ সেপ্টেম্বর তারিখে।

কবি কাজী নজরুল ইসলাম কর্তৃক অনুবাদকৃত গ্রন্থসমূহঃ

কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইরানের বিখ্যাত জীবনবাদী কবি ওমর খৈয়াম কর্তৃক রচিত ‘রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম’ কবিতাটি অনুবাদ করে, যে গ্রন্থটি ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত হয়। আর এই বিখ্যাত গ্রন্থটির ভূমিকা লিখেন সৈয়দ মুজতবা আলী।

অসম্ভব গুণ সম্পন্ন এই কবি পবিত্র কুরআন শরীফের ৩৮টি সুরা অনুবাদ করেন এবং ছন্দে ছন্দে তা সাজিয়ে ১৯৩৩ সালে ‘কাব্য আমপারা’ একটি গ্রন্থ প্রকাশিত করেন। এ ছাড়াও ‘দিওয়ানে হাফিজ’ ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে এবং ‘মক্তব সাহিত্য’ ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত করেন।

বাংলাদেশে আগমন এবং জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানঃ

১৯৭১ সালে লক্ষ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় বাংলাদেশে স্বাধীনতা, প্রতিষ্ঠা পায় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের। আর ঠিক তার পরের বছর অর্থাৎ ২৪ মে ১৯৭২ সালে তৎকালীন রা্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর বিশেষ উদ্যোগে এবং ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবারে বাংলাদেশে তথা ঢাকায় নিয়ে এসে ‘জাতীয় কবি’র মর্যাদা প্রদান করা হয়। এর মধ্যে অবাক করা বিষয় হচ্ছে, কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে ঘোষণার গেজেট জারী করা হয় ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ সালে। এরপর ৯ ডিসেম্বর ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ডি.লিট উপাধি প্রদান করা হয় এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক তাঁকে নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়, যা তাঁর মৃত্যুর মাত্র ছয় মাস পূর্বে। এরই মধ্যে ১৯৭৪ সালে কবি কাজী নজরুল ইসলামের সবচেয়ে ছোট ছেলে বিখ্যাত গীটার বাদক কাজী অনিরুদ্ধ মৃত্যুবরণ করেন। মূলত ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে তিনি অসুস্থ হয়ে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। এরপর ১৯৫২ খিষ্টাব্দে কবি ও কবি পত্নীকে রাঁচির এক মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছিল যেখানে তিনি চার মাস ছিলেন। এর পরের বছর ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে কবি এবং কবি পত্মীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে ডিসেম্বর মাসে কবিকে পরীক্ষা করা হয় এবং ফলাফলের উপর ভিত্তি করে ড. হফ বলেন যে, কবি পিকস ডিজিজ নামক একটি নিউরনজনিত সমস্যায় ভুগছেন।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী-শেষ কথাঃ

নানা গুণে গুণান্বিত এই মহান কারিগরকে নিয়ে লেখা শেষ করা যাবে না। সুতরাং প্রতিবারের মতো এবারেও ২৪ মে বাংলাদেশের নানা স্থানে এই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠিত হবে। আসলে কবির সাহিত্যের বিচিত্র ক্ষেত্রে ছিল বিস্ময়কর পদচারণ। তিনি একাধারে কবিতা, উপন্যাস ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, পত্র সাহিত্যসহ গজল, খেয়াল এবং রাগ প্রধান গান রচনা করে সারাবিশ্বে খ্যাতি অর্জন করেন। বলাবাহুল্য যে, তিনি মুক্ত ছন্দের প্রবর্তক এবং সর্বপ্রথম তিনিই ইসলামি গান ও গজল রচনা করেছিলেন। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের রণসংগীতের রচয়িতা কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ক্ষণজন্মা এই মহাপুরুষ অর্থাৎ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী নানা কর্মকাণ্ডে মুখরিত হয়ে উঠুক সারা বাংলাদেশ।

আরও পড়ুনঃ ভালোবাসা আর প্রেম কী একই বিষয় না আলাদা, ভালোবাসা ও প্রেমের মধ্যে পার্থক্য কি?

যাইহোক, আজকের আলোচ্য বিষয়সমূহ আশা করি আপনাদের বিস্তারিত বর্ণনার প্রয়োজন হবে না। কারণ আমরা প্রত্যেকেই কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বিভিন্ন প্রকারে, বিভিন্ন মাধ্যমে, বিভিন্ন সৃষ্টিশীলতা এবং নানা কর্মগুণের মাধ্যমে এবং সর্বোপরি হৃদয়ের মণিকোঠরে তাঁকে আসীন করে রেখেছি। তাই আগামী ২৪ মে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী পালিত হোক আরও স্বতঃস্ফুর্তভাবে, আরও উৎসাহ-উদ্দীপনায়। প্রিয় পাঠক, নজরুল ইসলাম কোন সাধারণ মানুষ নন, তিনি অসামান্য প্রতিভার অধিকারী এক অসাধারণ মানুষ। তাই তার বিষয়ে আজকের আলোচনায় যা কিছু তুলে ধরতে পেরেছি, জানিনা সেটি আপনাদের কতখানি উপকৃত করতে পারবে। আসলে সমস্যা হলো, কি লিখবো, কিভাবে লিখবো, কিভাবে শুরু করতে হবে, কোনটি রাখা উচিত ইত্যাদি অসংখ্য চিন্তার মাঝে একটা কিছু তৈরি করে আপনাদের মাঝে ছেড়ে দিলাম। ভুল-ত্রুটি মার্জ করবেন। পরিশেষে আজকের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী বিষয়ক আলোচনায় আপনাদের সর্বাত্মক উপস্থিতি এবং দীর্ঘক্ষণ সঙ্গে থাকার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url
Mithu Sarker
Mithu Sarker
আমি মিঠু সরকার, দুই বছর ধরে ডিজিটাল মার্কেটিং ও এসইও ফ্রেন্ডলি আর্টিকেল লিখে আসছি। ব্লগ পোস্ট, ওয়েব কনটেন্ট ও মার্কেটিং রাইটিংয়ে আমার বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। মানসম্মত ও পাঠকবান্ধব লেখার মাধ্যমে অনলাইন সফলতা গড়াই আমার লক্ষ্য।