শিশুর খাবারে বাড়তি লবণ-চিনি, হতে পারে যে সমস্যাগুলো

আপনার শিশুর খাবারে বাড়তি লবণ-চিনি যোগ করছেন না তো প্রতিদিন, যদি করেই থাকেন, তাহলে হতে পারে যে সমস্যাগুলো, যেমন-কিডনিতে পাথর, উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধি, দাঁতের ক্ষয়, ডায়াবেটিসজনিত সমস্যা, স্থুলতা বৃদ্ধি, ডিহাইড্রেশন ইত্যাদি। তাই এগুলো বিষয়ে জানতে নিচের লেখাগুলো পড়ুন।
শিশুর-খাবারে-বাড়তি-লবণ-চিনি, হতে-পারে-যে-সমস্যাগুলো
সাধারণত শিশুদের একটি নির্দিষ্ট বয়স পার হওয়ার পরই শক্ত খাবার প্রদান করা হয়ে থাকে, এটা আমরা অনেকেই জানি। অর্থাৎ সেক্ষেত্রে শক্ত খাবার প্রদানের পাশাপাশি শিশুর খাবারে বাড়তি লবণ-চিনি যোগ করছেন কিনা? যদি বাড়তি লবণ-চিনি যোগ করে থাকেন, তাহলে, হতে পারে যে সমস্যাগুলো তা জানতে নিচের বর্ণনাগুলো মনোযোগ সহকারে পড়তে থাকুন।

পেজ সূচিপত্রঃ শিশুর খাবারে বাড়তি লবণ-চিনি, হতে পারে যে সমস্যাগুলো

শিশুর খাবারে বাড়তি লবণ-চিনি, হতে পারে যে সমস্যাগুলো
কত মাস বয়সে শিশুকে সুষম খাদ্য দেয়া হয়
শিশুদের খাদ্যে লবণের পরিমাণসমূহ
শিশুদের খাদ্যে চিনির পরিমাণসমূহ
শিশুদের খাদ্যে চিনির বিকল্প কি হতে পারে
চিকিৎসকের মতে শিশুকে কী খাওয়ানো উচিত
পরিশেষে

শিশুর খাবারে বাড়তি লবণ-চিনি, হতে পারে যে সমস্যাগুলোঃ

শিশুর খাবারে বাড়তি লবণ-চিনি এড়িয়ে যেতে হবে। না হলে দেখা দিবে নানান সমস্যাবলীঃ

কিডনিতে পাথর হওয়াঃ আসলে লবণ থেকে অতিরিক্ত সোডিয়াম নিলে শরীর তা মূত্রের মাধ্যমে আরও বেশি ক্যালসিয়াম বের করে দিতে পারে। অর্থাৎ এই অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম কিডনির পাথর তৈরীতে সহায়তা করে থাকে।

উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধিঃ শিশুদের খাদ্যে অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ করার ফলে প্রাপ্ত বয়স্ককালে শিশুদের উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। অর্থাৎ শিশুদের খাদ্য প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে করে অতিরিক্ত লবণ ব্যবহার করা না হয়।

দাঁতের ক্ষয়জনিত সমস্যাঃ অতিরিক্ত পরিমাণে চিনি গ্রহণ করার ফলে শিশুদের দাঁতের ক্ষতি হতে পারে আবার মুখের মধ্যে থাকা ব্যাকটেরিয়াসমূহ খাদ্য থেকে চিনি ব্যবহার করে দাঁতের ক্ষতি হয় এমন অ্যাসিড উৎপাদন করে।

আরও পড়ুনঃ মধুর যত পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা

ডায়াবেটিসজনিত সমস্যাঃ শিশুদের অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের ফলে জীবনের পরবর্তী সময়ে টাইপ ২ ডায়াবেটিস হতে পারে। তবে অনেকেই অতিরিক্ত ভালোবাসা প্রদর্শনের ক্ষেত্র হিসেবে অথবা শিশুর আবদার মেটানোর প্রচেষ্টায় শিশুকে অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাদ্য সরবরাহ বা প্রদান করে থাকে, যা পরবর্তীতে সেই শিশুটির ডায়াবেটিসজনিত সমস্যা হয়ে থাকে।

স্থুলতা বৃদ্ধিঃ অর্থাৎ অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের ফলে শরীরে পর্যাপ্ত ক্যালোরি জমা হয়ে তা চর্বিতে রূপান্তরিত হয়, আর এর ফলে শিশু পরবর্তী সময়ে স্থুলতা হয়ে উঠে। শিশুদের শারীরিক স্থুলতার অন্যতম কারণ হলো অতিরিক্ত শর্করা গ্রহণ। এক্ষেত্রে শিশুর নিকটাত্মীয় বা পিতা-মাতার অতিরিক্ত ভালোবাসার ফলস্বরূপ শিশুর স্থুলতাও অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।

মজবুত হাড়ের সমস্যাঃ শিশুদের খাদ্যে অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার ফলে সোডিয়ামের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, আর এর ফলে অত্যধিক ক্যালসিয়াম শরীর থেকে নিষ্কাষিত হয়। এই কারণে শিশুদের হাড় ভঙ্গুর অর্থাৎ মজবুত হাড়ের সমস্যা দেখা দেয়।

ডিহাইড্রেশনজনিত সমস্যাঃ শিশুদের খাদ্যে অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের ফলে তা ডিহাইড্রেশনজনিত সমস্যার সৃষ্টি হয়। কারণ শরীরে অতিরিক্ত লবণ প্রবেশ করার ফলে, তা শরীরকে প্রস্রাব ও ঘামের আকারে জল বিয়োজিত করায়। অর্থাৎ অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের ফলে যে ডিহাইড্রেশনজনিত সমস্যার সৃষ্টি হয়, তা হলো-কিডনির পাথর, জয়েন্ট ও পেশীর ক্ষতি, লিভারের ক্ষতি এবং সর্বোপরি কোষ্ঠকাঠিন্যজনিত সমস্যা।

কত মাস বয়সে শিশুকে সুষম খাদ্য দেয়া হয়ঃ

সাধারণত ছয় মাস বয়স পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধই শিশুদের জন্য প্রকৃত এবং পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। তবে ৬ মাস বয়স পার হওযার পর তাদের সুষম খাদ্য প্রদান করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ সুষম খাদ্য হলো-শর্করা, আমিষ, স্নেহ, ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানিসহ ছয়টি উপাদান। ছয় মাস বয়সের পর থেকে বুকের দুধের পাশাপাশি শিশুদের এই খাবারগুলো সরবরাহ করতে হয়। আর তাই এ সময়ে শিশুদের খাবারে লবণ বা চিনি যোগ করা যেতে পারে, তবে তা খুবই সামান্য।

আরও পড়ুনঃ শিশুদের রাগ নিয়ন্ত্রণের কৌশল সমূহ

কারণ হলো, মায়ের বুকের দুধের মধ্যেও শিশু লবণ, চিনি এবং বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে থাকে। তবে, শিশুদের খাবারে লবণ যোগ করার সময় অবশ্যই শিশুর বয়স এবং ওজনের বিষয়টি মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যেন কোনমতেই শিশুর খাবারে বাড়তি লবণ-চিনি দেয়া না হয়, আর যদি তা প্রদান করা হয়, তাহলে হতে পারে যে সমস্যাগুলো, যেগুলি শিশুদের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।

শিশুদের খাদ্যে লবণের পরিমাণসমূহঃ

  • সাধারণত ৬ মাস বয়সী শিশুদের খাদ্যে লবণ না দেয়াই যুক্তিযুক্ত। কারণ এই সময়ে শিশু মাতৃদুগ্ধ পান করে থাকে, ফলে তাতেই সে পর্যাপ্ত পরিমাণে লবণ ও চিনি গ্রহণ করে থাকে।
  • আবার ৭ থেকে ১২ মাস বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রেও লবণ না দেয়ার পরামর্শ প্রদান করা করা হয়ে থাকে, কেননা এই সময়ে শিশুদের কিডনি যথাযথভাবে কাজ শুরু করেনি।
  • তবে ১ থেকে ৩ বছর বয়সী শিশুদের জন্য সর্বোচ্চ ১ গ্রাম পর্যন্ত খাদ্যে লবণ দেয়া যেতে পারে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে লবণের বিকল্প খাদ্যগুলো শিশুকে খাওয়ানো যেতে পারে। কারণ অতিরিক্ত লবণের ফলে শিশুর শারীরিক সমস্যা তৈরি হয়ে থাকে।
  • আবার ৪ থেকে ৮ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ১.৫ গ্রাম পর্যন্ত খাদ্যের লবণ দেয়া যেতে পারে। অবশ্য অনেকেই বিষয়গুলো না জানার কারণে শিশুদের খাদ্যে অতিরিক্ত লবণ মিশ্রিত করে থাকে।

শিশুদের খাদ্যে চিনির পরিমাণসমূহ:

  • সাধারণত ০ থেকে ১২ মাস বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রেও চিনি না দেয়া ভালো। কারণ এ সময়ে তারা ফলমূলের মধ্যে থাকা প্রাকৃতিক চিনিই তাদের জন্য যথেষ্ট। যদি একান্তই শিশুকে চিনি খাওয়ানো দরকার হয়ে পড়ে, তাহলে প্রাকৃতিক নানারকম ফলগুলো দিয়ে তা পূরণ করতে পারলে তা শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হবে।
  • যেসব শিশুর বয়স ১ থেকে ২ বছরের মধ্যে, তাদের অবশ্য প্রাকৃতিক চিনি দেয়া যেতে পারে, তবে আর্টিফিসিয়াল সুগার বা প্রক্রিয়াজাত চিনি তাদের খাদ্যে সরবরাহ না করাই উত্তম।
  • ৩ বছর এবং তৎপরবর্তী সময়ে শিশুদের অবশ্য প্রাকৃতিক চিনি, ফলমূল এবং বিভিন্ন শস্য খাদ্যে অন্তর্ভূক্তকরণের মাধ্যমে তা থেকে প্রাকৃতিক চিনি গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্ডি বা প্রক্রিয়াজাত চিনি পরিহার করা উচিত।

শিশুদের খাদ্যে চিনির বিকল্প কি হতে পারে:

শিশুদের খাদ্যে চিনিক বিকল্প হিসেবে নারকেল চিনি, তাল মিছরি, স্টেভিয়ার বা মঙ্ক ফল এর মতো প্রাকৃতিক মিষ্টি দেয়া যেতে পারে। খেয়াল রাখতে হবে যে, কোনমতেই শিশুর বয়স অন্তত এক বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কোনমতেই চিনি বা চিনি জাতীয় খাদ্য না দেয়াই ভালো। অনেক সময় চিনির বিকল্প হিসেবে অবশ্য যে কোন ফলের ক্বাথ, আঙুরের রস এবং মধুও দেয়া যেতে পারে। তবে অবশ্যই অন্তত ৪ মাস বয়সের কম শিশুদের তা দেয়া যাবে না।

চিকিৎসকের মতে শিশুকে কী খাওয়ানো উচিত:

চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, শিশুদের বয়স ভেদে খাদ্য তালিকা করা উচিত। অর্থাৎ শিশুর বয়স ৬ মাস এর পর থেকে তাকে সহজপাচ্য খাদ্য প্রদান করতে হবে। যেমন-ভাত বা সুজি, আলু সেদ্ধ, মিষ্টি কুমড়া সেদ্ধ, গাজর সেদ্ধ, পাকা কলা, পাকা পেঁপে, আপেল বা নাশপাতি, ডাল স্যুপ ইত্যাদি। আবার যেসব শিশুর বয়স ৮ থেকে ৯ মাসের মধ্যে, তাদের জন্য বিভিন্ন ফল, যেমন-আপেল, আম, কলা, নাশপাতি, খেজুর, স্ট্রবেরি, বেদানা, আঙুর এবং ডাল দিয়ে সবজি খিচুড়ি দেয়া যেতে পারে। যেসব শিশুর বয়স এক বছর বা তার বেশি তাদের খাদ্য তালিকায় ফল ছাড়াও কম চর্বিযুক্ত পনির, সেদ্ধ ডিম, দুধ, রুটি বিভিন্ন ধরণের সবজি ইত্যাদি দেয়া যেতে পারে। তবে খেয়াল রাখবেন, প্রতিটা খাবারই শুরুতে অল্প পরিমাণে খাওয়াতে হবে এবং ধীরে ধীরে এর পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে। এ ছাড়াও উপরোক্ত খাদ্যাভাসগুলির কারণে শিশুর কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

শিশুর খাবারে বাড়তি লবণ-চিনি, হতে পারে যে সমস্যাগুলো-পরিশেষে:

সাধারণত স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তা আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু শিশুদের এই খাদ্যাভাস নিয়ে চিকিৎসক এবং বাড়ীর বয়োঃজেষ্ঠদের পরামর্শের মাঝে বাবা-মা সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা যে তারা কি করবে। কারণ শিশুর মঙ্গলই সবার লক্ষ্য। তাই শিশুর খাবারে বাড়তি লবণ-চিনি, হতে পারে যে সমস্যাগুলো বিষয়গুলো অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে।

আরও পড়ুন: হাড়ের ঘনত্ব বাড়ায় যে সব পুষ্টি উপাদান

যাইহোক, শিশুর খাবারে বাড়তি লবণ-চিনি, হতে পারে যে সমস্যাগুলো বিষয়ক আলোচনায় আপনার যদি কোন মন্তব্য/পরামর্শ থাকে, তাহলে তা কমেন্টের মাধ্যমে জানাতে পারেন। আর যদি আজকের আলোচনার বিষয় থেকে আপনার কোন জ্ঞান আহররণের কোন নিমিত্ত পান, তাহলে অবশ্যই তা অন্যদের শেয়ার করতে পারেন। মনে রাখবেন, শিশুদের সঠিক খাবারের অভ্যাসই তাদের ভবিষ্যত জীবনের সুস্থ্য ভিত গড়ে তোলে। পরিশেষে শিশুর খাবারে বাড়তি লবণ-চিনি, হতে পারে যে সমস্যাগুলো বিষয়ক আলোচনায় আপনার দীর্ঘক্ষণ সম্পৃক্ততার অসংখ্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url
Mithu Sarker
Mithu Sarker
আমি মিঠু সরকার, দুই বছর ধরে ডিজিটাল মার্কেটিং ও এসইও ফ্রেন্ডলি আর্টিকেল লিখে আসছি। ব্লগ পোস্ট, ওয়েব কনটেন্ট ও মার্কেটিং রাইটিংয়ে আমার বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। মানসম্মত ও পাঠকবান্ধব লেখার মাধ্যমে অনলাইন সফলতা গড়াই আমার লক্ষ্য।