পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি খাবার বাঁশ কোড়ল
আজকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি খাবার বাঁশ কোড়লসহ এই বাঁশ কোড়ল আসলে কি? খাওয়ারযোগ্য বাঁশ কোড়লের নামসমূহ, বাঁশ কোড়ল কিভাবে খাওয়া যায়, বাঁশ কোড়ল উৎপাদনের সময়কাল, বাঁশ কোড়লের উপকারিতাসমূহ সমস্ত বিষয় জানতে নিচের লেখাগুলো পড়ুন।
বর্তমানে বাঁশ কোড়ল পাহাড়িদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিকট অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি খাদ্য হয়ে উঠছে।
পেজ সূচিপত্রঃ পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি খাবার বাঁশ কোড়ল
পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি খাবার বাঁশ কোড়ল
বাঁশ কোড়ল আসলে কি?
খাওয়ারযোগ্য বাঁশ কোড়লের নামসমূহ
বাঁশ কোড়ল কিভাবে খাওয়া যায়
বাঁশ কোড়ল উৎপাদনের সময়কাল
বাঁশ কোড়লের উপকারিতাসমূহ
বাঁশ কোড়লের অপকারিতাসমূহ
শেষ কথা
পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি খাবার বাঁশ কোড়লঃ
মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি খাবার বাঁশ কোড়ল। আর এই বাঁশ কোড়লের জনপ্রিয়তার কারণগুলিও অত্যন্ত পরিশিলিত, যেমন-শুরুটা পাহাড়ী জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ধীরে ধীরে বাঙালি এবং পর্যটকদের নিকট জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। উর্লেখ্য যে, বাঁশ কোড়ল সবজিটি বর্ষা মৌসুমেই বেশি পাওয়া যায়।
আরও পড়ুনঃ মাথার স্ক্যাল্পে সমস্যা, সমাধানে কি পদক্ষেপ নেয়া যায়
বর্তমানে এই সবজিটি পার্বত্য অঞ্চলে একটি ঐতিহ্যবাহী ও সুস্বাদু খাবারে পরিণত হয়েছে সকলের নিকট। আর বলাই বাহুল্য যে, পাহাড়ে বসবাসরত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিকট এর জনপ্রিয়তা অনেক বেশি, তবে এই বাঁশ কোড়লের নামকরণে প্রত্যেক জনগোষ্ঠী নিজস্ব ভাষাগত নাম রয়েছে। এর সবজির জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো এটি বিভিন্ন পদে বা বিভিন্ন ভাবে রান্না করে খাওয়া যায় এবং বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি হাট-বাজারগুলোতে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় বলে বাঁশ কোড়ল দামের ক্ষেত্রেও একটা সহজলভ্যতা আছে।
বাঁশ কোড়ল আসলে কি?
প্রকৃত পক্ষে বাঁশ কোড়ল হলো বাঁশের গোড়ায় কচি যে নরম অংশটি থাকে, তাকেই বাঁশ কোড়ল বলা হয়। সাধারণত, মাটি থেকে ৪-৫ ইঞ্চি গজিয়ে ওঠা কচি বাঁশই হলো বাঁশ কোড়ল। অর্থাৎ বাঁশে পরিণত হওয়ার আগে স্থানীয় জনগোষ্ঠীরা এই বাঁশ গাছের গোড়া থেকে কচি অংশ সংগ্রহ করে তা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে থাকেন। মজার বিষয় হলো এই সবজিটি পাহাড়েই ভালো জন্মে থাকে।
খাওয়ারযোগ্য বাঁশ কোড়লের নামসমূহঃ
এই বাঁশ কোড়লকে চাকমা ভাষায় বলে বাচ্ছুরি, মারমা ভাষায় তা মেহ্যাং আবার ত্রিপুরাদের নিকট তা মেওয়া এবং তঞ্চঙ্গা ভাষায় বলে বাচ্ছুই। মূলত যে কোন বাঁশ কোড়লই খাওয়ার যোগ্য হয়না। আবার একেক বাঁশ কোড়লের স্বাদ একেক রকমের হয়ে থাকে। তবে যে সকল বাঁশ কোড়লগুলো খাওয়া যায়, তার মধ্যে অন্যতম হলো-মুলি বাঁশ, ডলু বাঁশ, ফারুয়া বাঁশ, মিতিঙ্গ্যা বাঁশ, বাজ্জে বাঁশ, কালিছুরি বাঁশসহ বেশ কয়েক প্রজাতির বাঁশ কোড়ল বান্দরবানে পাওয়া যায়।
কিভাবে বাঁশ কোড়ল খাওয়া যায়ঃ
সাধারণত পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ী জনগোষ্ঠীরা এই বাঁশ কোড়ল দ্বারা নানা পদের রেসিপি তৈরি করে থাকেন। যেমন-সবজি হিসেবে তরকারি বা ভাজি, শুটকি মাছ দিয়েও চমৎকার বাঁশ কোড়ল রান্না করা যায়।
আরও পড়ুনঃ শুটকি মাছ শরীরের জন্য উপকারী নাকি ক্ষতিকর?
বাঁশ কোড়ল লবণ ও মরিচ গুড়া দিয়ে ভাজি রান্না করা যায়, এছাড়াও শুটকি বা চিংড়ি মাছ দিয়েও চমৎকার সব রেসিপি তৈরি করা যায়, আবার চিংড়ি মাছের সাথে মিশিয়ে এটি চিংড়ির দোপেঁয়াজাও তৈরি করা যায়, বাঁশ কোড়ল দিযে আচার তৈরি করে তা দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষণ করা যায়। এ ছাড়াও বাঁশ কোড়ল দিয়ে বিভিন্ন ধরণের সবজির সাথে রান্না করে তা তরকারি হিসেবে খাওয়া যায়। বাঁশ কোড়ল দিয়েও সুস্বাদু স্যুপও তৈরি করা যায় এবং জনপিত্র সাইটারও তৈরি করা যায় এই বাঁশ কোড়ল দ্বারা।
বাঁশ কোড়ল উৎপাদনের সময়কালঃ
সাধারণত বাঁশ কোড়ল উৎপাদনের সময়কাল হলো মে মাস থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত। অর্থাৎ এ সময়ে বান্দরবানের বিভিন্ন বাজারে বাঁশ কোড়ল বিক্রি করে স্থানীয় অধিবাসীরা। অর্থাৎ বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ের হাট-বাজারগুলোতে প্রচুর পরিমাণে বাঁশ কোড়ল পাওয়া যায়।
বাঁশ কোড়লের উপকারিতাসমূহঃ
বাঁশ কোড়লের অনেক উপকারিতা রয়েছে। যেমন-এটি হজম শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে, ফাইবার ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান রয়েছে প্রচুর, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, পেট পরিস্কার রাখতে সহায়তা করে, রক্তে কোলেস্টেরল ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা, ত্বক ও চুলের যত্নে উপকারিতাসহ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা, মস্তিস্কের কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়তা, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা সহ নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এই বাঁশ কোড়ল।
বাঁশ কোড়লের অপকারিতাসমূহঃ
মূলত বাঁশ কোড়লের যেমন নানান উপকারিতা রয়েছে, ঠিক তেমনি এর অপকারিতা আছে। যেমন-উৎপাদিন বাঁশ কোড়লগুলির মধ্যে বিশেষ কিছু ধরণের বাঁশ কোড়ল আছে, যেগুলি খাওয়ার ফলে সৃষ্টি হতে পারে অ্যাল্যার্জি। যেমন-ত্বকে চুলকানি বা জ্বালাপোড়া করা, অনেক সময় হজমেও অস্বস্তি হতে পারে। এছাড়াও বাঁশ কোড়ল যদি সঠিকভাবে বা নিয়মানুযায়ী রান্না করা না হয় অথবা বেশি পরিমাণে খাওয়ার ফলে পেটে গ্যাস বা বদহজমের মত সমস্যা দেখা দিতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো, বাজার থেকে ক্রয়কৃত বাঁশ কোড়লগুলি যদি সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত না করা হয়, তাহলে তাতে ঝুঁকি থাকতে পারে। বিশেষ করে বিক্রেতারা যদি এই বাঁশ কোড়লকে সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত না করে বিক্রি করে থাকে, তাহরে এটি অনেক সময় বিষাক্ত পদার্থও তৈরি করতে পারে। অবশ্য গর্ভবতী মহিলাদের সাধারণত বাঁশ কোড়ল এড়িয়ে চলাই ভালো, কারণ এতে থাকা রাসায়নিক বা বিষাক্ত পদার্থ তাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। তাই বাঁশ কোড়ল খাওয়ার আগে অবশ্যই উপরোক্ত বিষয়গুলি স্মরণে রাখতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি খাবার বাঁশ কোড়ল-শেষ কথাঃ
অর্থাৎ পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি খাবার বাঁশ কোড়ল বিষয়ক আলোচনায় জানতে পারবেন, বাঁশ কোড়ল এর নামকরণ বা কেন বলা হয়, বাঁশ কোড়ল কখন ও কোথায় পাওয়া যায়, কিভাবে তা খাওয়া হয়, কোন মৌসুমে তা পাওয়া যায় ইত্যাদি বিষয়ে। সাধারণত ভোজন রসিক মানুষদের জন্য যে কোন নতুন খাবারই বাড়তি চমক। মূলত বাঁশ কোড়ল পাহাড়ি রন্ধন প্রণালীর অন্যতম উপাদান হলেও যা সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রিয় খাদ্য হিসেবে পরিচিত লাভ করছে, কারণ এটি যথাযথভাবে সিদ্ধ এবং সঠিক মশলা মিশিয়ে রান্না করলে এর স্বাদে আসে এক অনন্য পাহাড়ি ঘ্রাণ। আসলে বাঁশ কোড়ল সংরক্ষণও করা যায়।
আরও পড়ুনঃ সকালের নাস্তা না করলে শরীরের যে ক্ষতি হতে পারে
অর্থাৎ ফ্রিজে ৫-৭ দিন পর্যন্ত খোসাসহ রাখা যায় আবার খোসা ছাড়িযে হালকা সিদ্ধ করেও তা ডিপ ফ্রিজে অন্তত ১৫-২০ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। তবে সংরক্ষণ করার সময় অবশ্যই এটি ভালোভাবে মুছে বা শুকিয়ে নিয়ে রাখতে হবে, যাতে কোন প্রকার পানি না থাকে। সুতরাং আজকের পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি খাবার বাঁশ কোড়ল বিষয়ক আলোচনাটি আশাকরি আপনারা বুঝতে পেরেছেন। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক মুক্ত, ফাইবার ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ এই বাঁশ কোড়ল। আজকের আলোচনায় যদি কোন মন্তব্য/পরামর্শ থাকে তাহলে অবশ্যই তা কমেন্টের মাধ্যমে জানাতে পারেন। পরিশেষে পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি খাবার বাঁশ কোড়ল সম্পর্কিত আলোচনায় আপনার দীর্ঘক্ষণ সম্পৃক্ততার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ এবং সেইসঙ্গে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url